চিলাহাটি

ঐতিহ্যের জনপদ

history banner
চিলাহাটির ইতিহাস

চিলাহাটি: প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান

পাল, সেন ও কোচ রাজবংশের ঐতিহ্যে ঘেরা এক ভূখণ্ডের গল্প। জানুন এই জনপদের প্রাচীন আদি উৎস এবং সাংস্কৃতিক যাত্রার আদ্যোপান্ত।

চিলাহাটির ভৌগলিগ অবস্থানঃ

চিলাহাটি বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলায় অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং সীমান্ত এলাকা। এর ভৌগোলিক অবস্থান সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো: চিলাহাটির ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত এবং গুরুত্বপূর্ণ। এর উত্তর দিকে সরাসরি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা এবং বিখ্যাত হলদিবাড়ি সীমান্ত অবস্থিত। দক্ষিণে রয়েছে নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলা সদর এবং এর আরও গভীরে গেলে নীলফামারী সদর উপজেলা পাওয়া যায়। চিলাহাটির পূর্ব দিকে নীলফামারী জেলারই ডিমলা উপজেলা অবস্থিত এবং এর পশ্চিম দিকে রয়েছে পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলা। মূলত তিনটি ভিন্ন উপজেলার সীমানা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের সংযোগস্থলে চিলাহাটির অবস্থান।

ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক: এটি প্রায় ২৬.২৪৪৬° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮.৭৯৬৩° পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত।
সীমান্তবর্তী গুরুত্বঃ এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার সীমান্তের খুব কাছে অবস্থিত। এটি একটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশন যা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
ভূপ্রকৃতিঃবাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানকার ভূপ্রকৃতি সমতল এবং এটি মূলত হিমালয়ের পাদদেশের পলল সমভূমির অংশ।
জলবায়ুঃএখানে সাধারণত উপ-ক্রান্তীয় আর্দ্র জলবায়ু অনুভূত হয়। শীতকালে এখানে বেশ ভালো ঠান্ডা থাকে এবং বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
যোগাযোগঃচিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনটি এই অঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র, যা ঢাকা ও অন্যান্য শহরের সাথে সরাসরি ট্রেন সংযোগ রক্ষা করে।

চিলাহাটির আদি ইতিহাস: এক প্রাচীন জনপদের বিবর্তনঃ

চিলাহাটির ইতিহাস কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজবংশের নয়, বরং এটি বিভিন্ন যুগ, সংস্কৃতি এবং বীরত্বের এক বিশাল ক্যানভাস। তিব্বত-ভুটান সীমান্তের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদের ইতিহাসটি আমরা প্রধান ৪টি ধাপে দেখে নিতে পারি:

পৌরাণিক ও আদি কাল: মৎস্য ও কামরূপ রাজ্যঃ

প্রাচীন বাংলার মানচিত্রে চিলাহাটি অঞ্চলটি ছিল কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
মহাভারতের যোগসূত্রঃ জনশ্রুতি আছে যে, মহাভারতের যুগের রাজা বিরাটের 'মৎস্য দেশ' এর উত্তর প্রান্তের কাছাকাছি ছিল এই এলাকা।
ভৌগোলিক চিত্রঃ একসময় এটি ছিল বিশাল জলাভূমি ও ঘন জঙ্গলে ঘেরা এক রহস্যময় ভূমি। স্থানীয় লোকগাথা অনুযায়ী, মানুষের বসবাসের আগে এখানে জলজ প্রাণীর আধিপত্য ছিল।

তথ্যসূত্রঃ

বই:Social History of Kamarupa - নগেন্দ্রনাথ বসু।

বই:History of Assam - স্যার এডওয়ার্ড গেইট (Sir Edward Gait)।

পাল ও সেন আমলের প্রভাবঃ

খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলায় পাল এবং সেন রাজবংশের রাজত্ব ছিল। যদিও চিলাহাটি সরাসরি তাদের রাজধানী ছিল না, তবে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
সীমান্ত অঞ্চলঃ এটি ছিল প্রাচীন বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা।
স্থাপত্যের নিদর্শনঃ নীলফামারীর নিকটস্থ ধর্মপালের গড় বা প্রাচীন দিঘিগুলো প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলটি পাল ও সেন রাজাদের কাছে শিকার বা ভ্রমণের জন্য অত্যন্ত প্রিয় ছিল। এ সময়েই এখানে বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন তৈরি হয়।

তথ্যসূত্রঃ

বই: 'The History of Bengal' (Vol-1)- ড. আর. সি. মজুমদার (R. C. Majumdar)।

কোচ ও কামতা সাম্রাজ্যের উত্থানঃ

চিলাহাটির প্রকৃত ইতিহাসের মোড় ঘোরে কামতা ও কোচ রাজবংশের শাসনামলে। এই অঞ্চলটি ছিল কোচবিহার রাজ্যের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি।
হাতিশালা ও নামকরণঃ কোচ রাজারা এখানে তাদের সৈন্যদল এবং হাতি রাখতেন। অনেকের ধারণা, এই 'হাতিশালা' বা হাতির ছাউনি থেকেই এলাকার নামের একটি অংশের উৎপত্তি।
বাণিজ্যিক কেন্দ্রঃ প্রাচীনকালে তিব্বত, ভুটান এবং সিকিমের সাথে বাংলার বাণিজ্যের প্রধান পথ ছিল এটি। পাহাড়ি বন থেকে সংগৃহীত মধু, কাঠ এবং হাতির দাঁতের ব্যবসার জন্য এটি বিখ্যাত ছিল।

তথ্যসূত্রঃ

কোচ রাজবংশীয় নথিপত্র: কোচবিহারের রাজদরবারের ইতিহাস যা 'রাজোপাখ্যান' নামে পরিচিত। এতে কোচ রাজাদের সীমানা এবং সীমান্ত চৌকি (চিলাহাটি সংলগ্ন এলাকা) নিয়ে বর্ণনা আছে।

ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার: ব্রিটিশ আমলে সংকলিত 'Bengal District Gazetteers: Rangpur' (১৯১১) যা জে. এ. ভাস (J.A. Vas) লিখেছিলেন। এখানে নীলফামারী ও চিলাহাটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের উল্লেখ আছে।

সুলতানি ও মোগল আমলের সংঘর্ষঃ

মধ্যযুগে বাংলার সুলতান এবং মোগল সম্রাটদের সাথে কোচ রাজাদের দ্বন্দ্ব এই অঞ্চলের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করে।
রণক্ষেত্র চিলাহাটিঃ কোচবিহারের রাজাদের দক্ষিণমুখী অভিযান এবং মোগলদের উত্তরমুখী রাজ্য বিস্তারের লড়াইয়ে চিলাহাটি বারবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক মিলনঃ এই যুদ্ধবিগ্রহের সূত্র ধরেই উত্তর ভারত থেকে আসা সৈন্য এবং ধর্মপ্রচারক পীর-আউলিয়াদের আগমন ঘটে। এর ফলে স্থানীয় রাজবংশী (কোচ) সংস্কৃতি এবং বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির এক চমৎকার মিশ্রণ এই জনপদে গড়ে ওঠে।

তথ্যসূত্রঃ

তবকাত-ই-নাসিরী ও আকবরনামা: সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজি এবং মোগল সেনাপতি মানসিংহের কামরূপ অভিযানের বর্ণনায় এই অঞ্চলের যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বই: 'History of the Koch Kingdom'- - অরিজিৎ চৌধুরী এবং ড. সুখময় মুখোপাধ্যায়ের বাংলার সুলতানি আমলের ইতিহাস বিষয়ক বইসমূহ।

ব্রিটিশ আমলে চিলাহাটির ইতিহাস: রূপান্তর, জৌলুস ও বিচ্ছেদঃ

ব্রিটিশ শাসনামলে (১৭৫৭–১৯৪৭) চিলাহাটি কেবল একটি জনপদ ছিল না; এটি ছিল উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত হৃদপিণ্ড। এর ইতিহাস মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল: রেলওয়ে, নীল চাষ এবং সীমান্ত বাণিজ্য।

নীল চাষ ও নীলকরদের অত্যাচার (সূচনালগ্ন)

ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে এই অঞ্চলের উর্বর ভূমি নীলকরদের নজর কাড়ে।
জোরপূর্বক চাষঃ ব্রিটিশ নীলকররা ধান বা অন্য ফসলের বদলে কৃষকদের জোর করে নীল চাষে বাধ্য করত।
নীলকুঠির বিস্তারঃ চিলাহাটি, ডোমার ও নীলফামারী অঞ্চলে অসংখ্য নীলকুঠি গড়ে ওঠে।
শোষণের স্মৃতিঃ কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের কাহিনী আজও স্থানীয় লোকগাথায় বিষাদময় স্মৃতি হয়ে আছে। মূলত এই নীল চাষকে কেন্দ্র করেই ব্রিটিশদের প্রশাসনিক পদচারণা এই অঞ্চলে শুরু হয়।

রেলওয়ের স্বর্ণযুগ: চিলাহাটির মহীরূপান্তর (১৮৭০ - ১৯২৬)

চিলাহাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটে রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে।
বাণিজ্যিক রুটঃ ১৮৭০-এর দশকে চা ও পাট পরিবহনের জন্য কলকাতা থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত রেল সংযোগের পরিকল্পনা করা হয়।
নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়েঃ ১৮৭৫-১৮৮০ সালের মধ্যে এই রেলপথ নির্মিত হলে চিলাহাটি একটি বিশাল রেলওয়ে জংশন ও লোকোমোটিভ শেড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
আভিজাত্যের প্রতীকঃ ১৯১৫ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ চালুর পর এই পথ দিয়েই চলত বিখ্যাত 'দার্জিলিং মেইল'। এটি ছিল ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের পছন্দের আরামদায়ক ও বিলাসবহুল ভ্রমণের একমাত্র পথ।

বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ইউরোপীয় প্রভাবঃ

রেলপথ হওয়ার পর চিলাহাটি ব্রিটিশদের জন্য একটি 'সোনার খনি' হয়ে ওঠে।
পণ্যের ট্রানজিটঃআসাম ও ডুয়ার্সের চা এবং উত্তরবঙ্গের পাট এই পথ দিয়েই কলকাতায় রপ্তানি হতো।
শহর ও অবকাঠামোঃ ব্রিটিশ রেল কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের কারণে এখানে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। বড় বড় গুদামঘর, অফিসার্স কোয়ার্টার এবং সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা চিলাহাটিকে একটি ছোটখাটো শহরে রূপান্তর করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কৌশলগত গুরুত্ব (১৯৪০-এর দশক)

১৯৪০-এর দশকে বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে চিলাহাটির গুরুত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
মিলিটারি ট্রানজিটঃমিত্রশক্তির রসদ সরবরাহের জন্য এই রুটটি দিনরাত ব্যবহৃত হতো।
বার্মা ফ্রন্টঃ জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে থাকা ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে খাবার, ঔষধ এবং অস্ত্র পাঠানোর জন্য চিলাহাটি ছিল অন্যতম প্রধান কৌশলগত পয়েন্ট।

দেশভাগ ও রেললাইন বিচ্ছিন্ন হওয়া (১৯৪৭)

ব্রিটিশ আমলের শেষ প্রান্তে এসে ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হয়, তখন চিলাহাটির ইতিহাসে বিয়োগান্তক অধ্যায় শুরু হয়।
সীমানা নির্ধারণঃর‍্যাডক্লিফ লাইনের ফলে চিলাহাটি পড়ে পূর্ব পাকিস্তানে এবং এর পরের স্টেশন 'হলদিবাড়ি' পড়ে ভারতে।
জৌলুস ম্লানঃ ব্রিটিশদের তৈরি সেই নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এক ধাক্কায় আন্তর্জাতিক সীমান্তে পরিণত হয়। পাসপোর্ট-ভিসার কড়াকড়িতে এক সময়ের জমজমাট ট্রানজিট পয়েন্টটি প্রাণহীন হতে শুরু করে।

পাকিস্তান আমলে চিলাহাটি: সীমান্ত বিচ্ছেদ ও মুক্তির সংগ্রাম (১৯৪৭-১৯৭১)

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর চিলাহাটির ইতিহাসে এক নতুন এবং কিছুটা ম্লান অধ্যায় শুরু হয়। ব্রিটিশ আমলের সেই জৌলুস আন্তর্জাতিক রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে স্তিমিত হয়ে এলেও, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে চিলাহাটি বীরত্বগাথার এক অনন্য সাক্ষী হয়ে ওঠে।

দেশভাগ পরবর্তী অবস্থা (১৯৪৭ - ১৯৬৪)

দেশভাগের পর চিলাহাটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নীলফামারী মহকুমার (রংপুর জেলা) একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত স্টেশনে পরিণত হয়।
সীমান্তের কাঁটাতারঃভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এই রুট দিয়ে সীমিত পরিসরে ট্রেন চলাচল বজায় ছিল।
বাণিজ্যে ভাটাঃ কলকাতা থেকে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ব্রিটিশ আমলের সেই বিশাল বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। মূলত একটি স্থানীয় শুল্ক স্টেশন (Customs Station) হিসেবে এটি টিকে থাকে।

১৯৬৫-এর যুদ্ধ ও স্থায়ী বিচ্ছেদঃ

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। রেললাইনের ওপর বড় বড় কাঁটাতারের বেড়া এবং দুই দেশের সীমান্তে বাঙ্কার তৈরি করা হয়। এক সময়ের ব্যস্ততম জংশনটি তখন কেবল একটি প্রান্তিক সামরিক চেকপয়েন্টে রূপান্তরিত হয়।

১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধে চিলাহাটি ও সেক্টর পরিচিতি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চিলাহাটি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত একটি এলাকা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত এবং রসদ সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট ছিল।
সেক্টর পরিচিতিঃমহান মুক্তিযুদ্ধে চিলাহাটি ও নীলফামারী অঞ্চল ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার এম. খাদেমুল বাশার।
কৌশলগত গুরুত্বঃ ৬ নম্বর সেক্টরটি ছিল বাংলাদেশের একমাত্র সেক্টর যার সদর দপ্তর বাংলাদেশের ভেতরে (বুড়িমারী, লালমনিরহাট) ছিল। চিলাহাটি সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি অংশ ভারতে ট্রেনিং নিয়ে পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করত।

চিলাহাটি মুক্ত দিবস: ৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১

দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ডিসেম্বরের শুরুতে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে।
চূড়ান্ত বিজয়ঃ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর চিলাহাটি সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়।
মুক্তির মুহূর্তঃ ওই দিন মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় মুক্তিকামী মানুষের সহায়তায় চিলাহাটি স্টেশনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। পাকিস্তানি সেনারা পরাজিত হয়ে সৈয়দপুর সেনানিবাসের দিকে পালিয়ে যায়।

স্বাধীন বাংলাদেশ ও বর্তমান চিলাহাটি: পুনর্জন্মের এক নতুন অধ্যায়

১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ অবধি চিলাহাটির ইতিহাসে বেশ কিছু চড়াই-উতরাই এসেছে। দীর্ঘ নীরবতার পর বর্তমানে চিলাহাটি তার হারানো জৌলুস ফিরে পেতে শুরু করেছে।

স্বাধীনতার পরবর্তী স্থবিরতা (১৯৭২ - ২০০৯)

স্বাধীনতার পর অনেক বছর চিলাহাটি কেবল একটি অবহেলিত প্রান্তিক স্টেশন হিসেবে টিকে ছিল।
বিচ্ছিন্ন যোগাযোগঃ১৯৬৫ সালে বন্ধ হওয়া ভারতের সাথে রেল যোগাযোগটি পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ দীর্ঘ সময় নেওয়া হয়নি।
সীমান্ত অর্থনীতিঃ এই সময় চিলাহাটি মূলত ছোটখাটো সীমান্ত বাণিজ্য এবং কৃষিনির্ভর একটি জনপদে সীমাবদ্ধ ছিল। এক সময়ের বিশাল লোকোমোটিভ শেড ও ব্রিটিশ অবকাঠামোগুলি ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে।

ল্যান্ড পোর্ট বা স্থলবন্দরের ঘোষণা

চিলাহাটির ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বর্তমানে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শুল্ক স্টেশন (Custom) হিসেবে কাজ করছে, যা দিয়ে ভারত থেকে পাথর, কয়লা ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করা হয়।

আধুনিক ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ: ৫৫ বছর পর রেল সংযোগ (২০২০)

চিলাহাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় ঘোরে ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে।
ঐতিহাসিক উদ্বোধনঃবাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চিলাহাটি (বাংলাদেশ) - হলদিবাড়ি (ভারত) রেল সংযোগটি পুনরায় উদ্বোধন করেন।
মালবাহী ট্রেন চলাচলঃ ২০২১ সালের ১ আগস্ট থেকে এই পথে ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়, যা ১৯৬৫ সালের পর প্রথম কোনো বাণিজ্যিক ট্রেনের প্রবেশ ছিল।

মিতালী এক্সপ্রেস: ফিরে পাওয়া সেই রাজকীয় পথ (২০২২)

ব্রিটিশ আমলের 'দার্জিলিং মেইল'-এর উত্তরসূরি হিসেবে ১ জুন ২০২২ তারিখে ঢাকা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত চালু হয় 'মিতালী এক্সপ্রেস'। এটি চিলাহাটি সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত করে, যার ফলে দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় পর এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়।

বর্তমান উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্প (২০২৪-২০২৬)

বর্তমানে চিলাহাটি কেবল একটি সাধারণ স্টেশন নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মডেলে রূপান্তর হচ্ছে।
আইকনিক রেল স্টেশনঃআধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে চিলাহাটিতে একটি দৃষ্টিনন্দন আন্তর্জাতিক রেল স্টেশন ও ইমিগ্রেশন ভবন নির্মিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ শিলিগুড়ি হয়ে নেপাল ও ভুটানের সাথে সহজ যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চিলাহাটি এখন "সার্ক কানেক্টিভিটি"-র মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইপিজেড (EPZ) ও শিল্পায়নঃ নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডের পণ্য এই রুট দিয়ে দ্রুত পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় পুরো অঞ্চলে কল-কারখানা ও কর্মসংস্থান বাড়ছে।

একনজরে বর্তমান চিলাহাটি: মাইলফলক

সাল/তথ্যবিবরণ
রেল সংযোগ স্থাপন১০ জুন, ১৮৭৮
পূর্ব নাম ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে
রেল সংযোগ পুনঃস্থাপন১৭ ডিসেম্বর, ২০২০
প্রথম পণ্যবাহী ট্রেন১ আগস্ট, ২০২১
মিতালী এক্সপ্রেস চালু১ জুন, ২০২২
বর্তমান অবস্থানআন্তর্জাতিক মানের ট্রানজিট ও স্থলবন্দর কেন্দ্র